নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা: লিবিয়া থেকে নৌকায় করে গ্রিসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশি তরুণ। ক্ষুধা, তৃষ্ণা আর দালালের নির্যাতনে মারা যাওয়া এই তরুণদের মরদেহ শেষ পর্যন্ত সাগরেই ফেলে দেওয়া হয়েছে। পচে যাওয়ার ভয়ে দুই দিন পর তাদের লাশ যখন পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তখন নৌকায় থাকা অন্য বাংলাদেশিদের কান্না আর হাহাকারে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।

এই মরণযাত্রা থেকে কোনোমতে বেঁচে ফেরা কিশোরগঞ্জের এক তরুণ জানান সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা। তিনি জানান, লিবিয়ার কুখ্যাত ‘গেমঘর’-এ তাদের এক মাস আটকে রেখে পশুর মতো পেটানো হতো। গত ২১ মার্চ লিবিয়ার তবরুক বন্দর থেকে যখন ৪৩ জনকে নিয়ে নৌকাটি ছাড়ে, তখন তাদের মনে ছিল গ্রিসে পৌঁছানোর আশা। কিন্তু মাঝ সমুদ্রে পথ হারিয়ে টানা ছয় দিন খাবার আর পানি ছাড়া ভাসতে হয় তাদের। সেই তীব্র ক্ষুধা আর কষ্টে একে একে মারা যান ২২ জন, যার মধ্যে ১৮ জনই বাংলাদেশি।

বেঁচে ফেরা সেই যুবক বলেন, “দুই দিন লাশগুলো নৌকার ভেতরেই ছিল। যখন পচে গন্ধ বের হতে শুরু করে, তখন দালালের কথায় আমরা বাধ্য হয়ে লাশগুলো সাগরে ফেলে দেই। নিজের ভাইদের শরীরগুলো যখন মাছের খাবারে পরিণত হচ্ছিল, তখন আমাদের কিছুই করার ছিল না।”

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই ভয়ংকর পাচার চক্রের পেছনে রয়েছে সুনামগঞ্জের ছাতক থানার দুই ভাই—দুলাল মিয়া ও বিল্লাল। বিল্লাল গ্রিসে বসে পুরো ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন আর দুলাল দেশে বসে তরুণদের প্রলোভন দেখান। নিহত আমিনুরের পরিবার জানায়, ১১ লাখ টাকার চুক্তিতে আমিনুরকে গ্রিসে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু তাকে পাঠানো হয় মৃত্যুর মুখে।

নিহত ১৮ জনের মধ্যে ১০ জনই সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। সিলেট এবং শরীয়তপুরের মানুষের মধ্যে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার তীব্র ঝোঁক রয়েছে। শরীয়তপুরের অনেক গ্রাম এখন ‘ইতালি পাড়া’ নামে পরিচিত। প্রবাসীদের গাড়ি-বাড়ি দেখে সেই নেশায় পড়ে হাজার হাজার তরুণ প্রতিবছর এভাবে সাগরে প্রাণ দিচ্ছেন। দালালদের এই মরণফাঁদে পা দিয়ে কত শত পরিবার যে আজ নিঃস্ব, তার কোনো হিসাব নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *