ভাত দে হারামজাদা একটি হাহাকার ও অর্ধশতকের ব্যবধানে ফিরে আসা প্রতিচ্ছবি
কবি রফিক আজাদ লিখেছিলেন তার বিখ্যাত কবিতা— “ভাত দে হারামজাদা, তা না হলে মানচিত্র খাবো।”
ইতিহাস নিষ্ঠুর, কিন্তু তার চেয়েও নিষ্ঠুর যখন সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। স্ক্রিনের বাম পাশের সাদাকালো ছবিটি ১৯৭৪ সালের। ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে খাবার খাওয়ার সেই বীভৎস দৃশ্য কিংবা লকলকে হাড় জিরজিরে জ্যান্ত কঙ্কালগুলোর মিছিল আজও বাংলার আকাশে-বাতাসে হাহাকার হয়ে ভাসে। সেই প্রেক্ষাপটেই কবি রফিক আজাদ গর্জে উঠেছিলেন তার কালজয়ী পঙ্ক্তিতে— “ভাত দে হারামজাদা, তা না হলে মানচিত্র খাবো।”
এটি কেবল একটি কবিতা ছিল না, এটি ছিল তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর অব্যবস্থাপনা, দুর্ভিক্ষ আর অনাহারের বিরুদ্ধে এক চূড়ান্ত আল্টিমেটাম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলের সেই ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে লাখ লাখ মানুষ অকাতরে প্রাণ দিয়েছিল। রাস্তার ধারে পড়ে থাকা লাশের সারি আর ক্ষুধার জ্বালায় মানুষের সেই আর্তনাদ আজও আমাদের জাতীয় স্মৃতির এক রক্তাক্ত ক্ষত। সেদিন যে ক্ষমতার দম্ভে ক্ষুধার্তের হাহাকারকে অবজ্ঞা করা হয়েছিল, তার চড়া মূল্য দিতে হয়েছিল পুরো জাতিকে।
সময়ের বিবর্তন, ক্ষুধার রূপান্তর ছবির ডান পাশের অংশটি ২০২২ সালের। মাঝখানে কেটে গেছে প্রায় পাঁচ দশক। কিন্তু দৃশ্যপট কি খুব বেশি বদলেছে? সেখানে আমরা দেখি আলমগীর কবির নামক এক উচ্চশিক্ষিত যুবককে, যিনি দেয়ালে বিজ্ঞাপন দিয়েছেন— “শুধুমাত্র দুবেলা ভাতের বিনিময়ে পড়াতে চাই।” এই একটি বাক্য যেন ১৯৭৪ সালের সেই ‘মানচিত্র খাওয়ার’ হুমকির এক আধুনিক ও করুণ সংস্করণ। পঁচাত্তর পূর্ববর্তী সেই দুর্ভিক্ষের ডামাডোল আর আজকের এই মধ্যবিত্তের নীরব হাহাকার—দুটোই একই সূত্রে গাঁথা। যখন রাষ্ট্র তার নাগরিকের ন্যূনতম অন্নের নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন আদর্শ, শিক্ষা আর মানচিত্র—সবকিছুই ক্ষুধার কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়।
অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে সত্যের মুখোমুখি একজন সাংবাদিক হিসেবে যখন আমি এই দুটি ছবিকে পাশাপাশি রাখি, তখন শরীরের লোম খাড়া হয়ে যায়। ৭৪-এর সেই দুর্ভিক্ষ ছিল প্রশাসনিক ব্যর্থতা আর দুর্নীতির এক চরম পরাকাষ্ঠা। আর আজকের এই সংঘাতময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে একজন শিক্ষিত যুবকের ‘ভাতের বিনিময়ে শ্রম’ দেওয়ার আকুতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, উন্নয়নের চাকচিক্যের নিচে ক্ষুধার সেই পুরনো দৈত্যটি আজও ওত পেতে আছে।
৭৪-এ মানুষ রাস্তায় মরে পড়ে থাকত, আর আজ মানুষ লোকলজ্জার ভয়ে ঘরের ভেতরে তিল তিল করে মরছে। শেখ মুজিবুর রহমানের সেই শাসন আমলের দুর্ভিক্ষের ইতিহাস আর আজকের এই সামাজিক অবক্ষয়—দুটোই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শাসক বদলায়, কাল বদলায়, কিন্তু সাধারণ মানুষের ‘ভাতের অধিকার’ আজও এক অনিশ্চিত লড়াই।
ইতিহাসের সেই অশ্রুভেজা অধ্যায় থেকে আমরা কি আদৌ কিছু শিখেছি? রফিক আজাদের সেই ক্ষুধার্ত রাক্ষুসে আহ্বান আর আলমগীরের এই বিনম্র করুণ আকুতি—দুটোই আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। পেটের আগুন যখন জ্বলে, তখন আইন, কানুন আর মানচিত্র কোনোটিই অবশিষ্ট থাকে না।
আজ সময় এসেছে আয়নার সামনে দাঁড়ানোর। ক্ষমতার মসনদে বসে যারা সাধারণের আর্তনাদ শুনতে পান না, তাদের মনে রাখা উচিত—ক্ষুধার্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাস যেকোনো সাম্রাজ্যকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।


Leave a Reply