নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ

নারায়ণগঞ্জ সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এখন অনিয়ম, ঘুষ লেনদেন আর দালালের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। দলিল নিবন্ধনে সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে রাজস্ব ফাঁকি এবং খোদ কর্মকর্তার সামনেই গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে সন্ত্রাসী আচরণের অভিযোগ উঠেছে। সোমবার (১৬ মার্চ) দুপুরে অফিসের ভেতরেই অনুসন্ধানী সাংবাদিকের ওপর হামলার চেষ্টা চালায় নকলনবিশ টিটু ও তার সহযোগীরা।

সোমবার দুপুর ১২টার দিকে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সাধারণ গ্রাহকদের হয়রানির অভিযোগ নিয়ে তথ্য সংগ্রহে যান সংবাদকর্মী। এসময় এজলাস কক্ষে সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল্লাহ আল ইমামের উপস্থিতিতেই নকলনবিশ টিটু (জহির) সাংবাদিকের কাজে বাধা প্রদান করেন। একপর্যায়ে সাধারণ মানুষের সামনেই প্রতিনিধিকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও শারীরিক হেনস্তা করে সন্ত্রাসী কায়দায় চড়াও হন টিটু। পুরো ঘটনা সাব-রেজিস্ট্রারের চোখের সামনে ঘটলেও তিনি ‘না দেখার ভান’ করে নীরব ভূমিকা পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, অফিসের ভেতরেই টিটু নিজের একটি ‘গোপন আস্তানা’ বা আয়নাঘর তৈরি করে গড়ে তুলেছেন দুর্নীতির সাম্রাজ্য।

নেত্রকোনা থেকে তদবির করে নারায়ণগঞ্জের এই ‘লোভনীয়’ পয়েন্টে পোস্টিং নেওয়া আব্দুল্লাহ আল ইমামের বিরুদ্ধে পাহাড়সম দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। দলিল প্রতি নির্দিষ্ট ‘অফিস খরচ’ না দিলে তিনি দলিলে নানা ভুল ধরে গ্রাহকদের হয়রানি করেন। অথচ ঘুষের টাকা মিললেই জমির প্রকৃত মূল্য কম দেখিয়ে দলিলে সই করেন তিনি, যার ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রেজিস্ট্রেশন ফি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বাইরে পরিপাটি ব্যবহারের আড়ালে তিনি ‘সাইলেন্ট রেজিস্ট্রার’ হিসেবে পরিচিত।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই দুর্নীতির মূলে রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। জেলা রেজিস্ট্রার আব্দুল হাফিজের মদদে প্রতিটি উপজেলায় ঘুষের নির্দিষ্ট ‘রেট’ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। বদলি বাণিজ্য, মোহরার নিয়োগ এবং রেকর্ড রুমে নকল বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এই চক্র। এই সিন্ডিকেটে জড়িত রয়েছেন মোহরার টিটু, উমেদার তৌহিদ এবং দলিল লেখক ভেন্ডার সমিতির প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দ। অডিট এলেই মোটা অঙ্কের খাম দিয়ে সব অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়া হয়।

যেকোনো দলিল সাব-রেজিস্ট্রারের টেবিলে যাওয়ার আগে তা টিটু ও জহির সিন্ডিকেটের হাত ঘুরে আসতে হয়। দলিলে ছোটখাটো ভুল থাকলেও ‘লাঞ্চ খরচ’ বাবদ অতিরিক্ত টাকা দিলেই তা চোখের ইশারায় পার হয়ে যায়। উমেদার তৌহিদের মাধ্যমে এসব টাকা লেনদেন হয় বলে ভুক্তভোগী গ্রাহকরা জানিয়েছেন। এমনকি পে-অর্ডারের কাজের জন্যও আলাদা ঘুষ দিতে হয় এখানে।

অভিযুক্ত সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল্লাহ আল ইমামের গ্রামের বাড়ি জামালপুরে। সেখানে তিনি গড়ে তুলেছেন আলিশান ভবন। এছাড়া ঢাকার মোহাম্মদপুর হাউজিংয়ে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটসহ নামে-বেনামে অসংখ্য প্লট ও সম্পত্তির মালিক তিনি। সরকারি বেতনভুক্ত একজন কর্মকর্তার এত বিপুল সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে জনমনে।

এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল্লাহ আল ইমামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, এই দুই কর্মকর্তা সাধারণত গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন না। ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল এই সিন্ডিকেট ভাঙতে এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *