নিজস্ব প্রতিবেদক
এক সময় যাকে বলা হতো ‘প্রাচ্যের ভেনিস’, সেই শান্ত নদীঘেরা বরিশাল নগরী এখন এক নীরব বিপর্যয়ের মুখে। চোখের সামনে ধরা না পড়লেও ভেতরে ভেতরে ধীরে ধীরে মাটির গভীরে দেবে যাচ্ছে পুরো শহর। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে এই ভয়াবহ তথ্য, যা ভবিষ্যতের জন্য এক অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর এবং জার্মান ফেডারেল ইনস্টিটিউট ফর জিওসায়েন্স অ্যান্ড ন্যাচারাল রিসোর্সেস-এর টানা ছয় বছরের যৌথ গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর চিত্র পাওয়া গেছে। স্যাটেলাইট ইমেজ এবং ভূগর্ভস্থ উপাদান পরীক্ষার পর বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, বরিশাল নগরী প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১.৬৬ মিলিমিটার করে নিচে নামছে। কোনো কোনো বছর এই দেবে যাওয়ার হার এক ইঞ্চি পর্যন্ত পৌঁছেছে।
গবেষকদের মতে, এই ধীর পতনের পেছনে প্রধানত দুটি কারণ দায়ী—অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন। নগরীর বিএম কলেজ এলাকা, বটতলা এবং করিমকুটির অঞ্চলে ইতোমধ্যে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। অনেক জায়গায় বহুতল ভবন হেলে পড়ার ঘটনাও শনাক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাটির সক্ষমতা যাচাই না করেই উঁচু ভবন নির্মাণ করায় মাটির ওপর চাপ বাড়ছে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে গভীর নলকূপের মাধ্যমে অপরিকল্পিতভাবে পানি তোলার ফলে মাটির নিচে বিশাল ফাঁপা স্তর তৈরি হচ্ছে। সেই শূন্যস্থান পূরণ করতেই উপরের মাটি ধসে নিচে বসে যাচ্ছে, যার ফলে পুরো নগরীই ধীরে ধীরে নিচু হয়ে যাচ্ছে।
বরিশালে পানির স্তর নেমে যাওয়ার বিষয়টি এখন চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক সময় যেখানে ৭০০ থেকে ৮০০ ফুট গভীরে গেলেই নিরাপদ পানি পাওয়া যেত, এখন সেখানে ১০০০ থেকে ১১০০ ফুট গভীরে যেতে হচ্ছে। এমনকি গ্রীষ্ম মৌসুমে ৩০ থেকে ৪০ ফুট নিচেও পানির দেখা মিলছে না। এতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগ বাড়ছে এবং দীর্ঘমেয়াদী সংকটের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
আপাতদৃষ্টিতে প্রতি বছর মিলিমিটার হিসেবে দেবে যাওয়াকে ছোট মনে হলেও, সময়ের ব্যবধানে তা মারাত্মক রূপ নিতে পারে। গবেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই হার অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই মাটির উচ্চতা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় সমান হয়ে আসবে। ফলে সামান্য জোয়ারেই প্লাবিত হবে বিস্তীর্ণ এলাকা। আর বড় কোনো জলোচ্ছ্বাস হলে বিপর্যয়ের মাত্রা হবে অকল্পনীয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয় এবং ভূগর্ভস্থ পানির বিকল্প ব্যবস্থা করা না যায়, তবে আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছরের মধ্যে বরিশালের বড় একটি অংশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে। গ্রিন সিটি হিসেবে পরিচিত এই জনপদকে রক্ষায় পরিকল্পিত নগরায়নই এখন একমাত্র পথ।
