ডেমরা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে সিন্ডিকেট রাজ ‘খাসলোক’ পরিচয়ে জাহাঙ্গীর আলমের দাপট
‘খাসলোক’ পরিচয়ে জাহাঙ্গীর আলমের দাপট
নিজস্ব প্রতিবেদক | বার্তাক নিউজ
সাবেক আইনমন্ত্রীর ‘ঘনিষ্ঠ’ থেকে রাতারাতি বর্তমান আইন উপদেষ্টার ‘আস্থাভাজন’— ভোল পাল্টে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন ডেমরা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের কর্মকর্তা মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। শরীয়তপুর সদরে আইনজীবীর কাছে চাঁদা দাবি করে বিতর্কের জন্ম দেওয়া এই কর্মকর্তা গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে ডেমরার একই চেয়ারে আসীন। তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন সাধারণ সেবাগ্রহীতারা।
সিন্ডিকেটের জালে ডেমরা অফিস অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডেমরা রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মকর্তা, কর্মচারী ও দলিল লেখক ভেন্ডার সমিতির সমন্বয়ে একটি অসাধু চক্র সক্রিয়। দলিল নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি, দায়িত্ব পালনে অবহেলা এবং নানা আইনি মারপ্যাঁচ দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা এই চক্রের প্রধান কৌশল। প্রতিটি দলিলে সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এখন এই অফিসের ওপেন সিক্রেট।
এই সিন্ডিকেটের মূল কারিগর হিসেবে কাজ করছেন অফিস সহকারী শাহজাহান, উমেদার সাজু এবং টিপসইয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মীরা। এমনকি আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ পাওয়া নকল নবিশরাও সরাসরি ঘুষের টাকা দাবি করছেন। প্রতিটি হেবা-ঘোষণাপত্র বা সাধারণ দলিলের ওপর পেন্সিলের সাংকেতিক চিহ্নের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয় ঘুষের পরিমাণ। টাকা না দিলে ‘কাগজে সমস্যা আছে’ বলে ভয় দেখানো হয়। এমনকি জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে (যেমন: নালা বা ডোবাকে ফ্রেশ জমি দেখানো) মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বিতর্কিত অতীত ও বর্তমান দাপট মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের কর্মজীবন জুড়েই রয়েছে বিতর্কের ছাপ। ২০২৩ সালে শরীয়তপুর সদরে থাকাকালীন এক আইনজীবীর কাছে ‘মিষ্টি খরচ’ বাবদ টাকা চেয়ে ব্যাপক সমালোচিত হন তিনি। সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে ডেমরায় বদলি করা হয়। তবে ডেমরায় এসে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে জাহাঙ্গীর আলমও নিজের পরিচয় বদলে ফেলেছেন। ৫ই আগস্টের আগে যিনি নিজেকে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের ছোট ভাই বা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দাবি করতেন, এখন তিনি বর্তমান আইন উপদেষ্টার নাম ভাঙিয়ে চলছেন। এমনকি বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস এসোসিয়েশনের (বি.আর.এস.এ) গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হয়ে সারাদেশের রেজিস্ট্রেশন পরিবারে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন।
সম্পদ বিবরণী ও সচিবালয় কাণ্ড ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার নির্দেশ দিলে জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে একদল সাব-রেজিস্ট্রার সচিবালয়ে গিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। অভিযোগ আছে, নিজের অবৈধ সম্পদ আড়াল করতেই তিনি সহকর্মীদের উসকে দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন।
ভুক্তভোগীদের আর্তনাদ প্রতিদিন ডেমরা অফিসে প্রায় দুই থেকে আড়াইশ দলিল রেজিস্ট্রি হয়। সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, প্রতিটি টেবিলে ‘ফিস’ বা ‘নাস্তা খরচ’-এর নামে টাকা না দিলে কাজ এগোয় না। দিনশেষে আদায়কৃত এই টাকার ভাগ চলে যায় সমিতির ফান্ড, সেরেস্তা ফান্ড এবং খোদ সাব-রেজিস্ট্রারের পকেটে।
এই বিষয়ে জাহাঙ্গীর আলমের বক্তব্য নিতে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, তিনি সাধারণত গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেন না এবং তার হয়ে সব পরিস্থিতি সামাল দেন উমেদার সাজু।
ডেমরা অফিসের এই ‘ঘুষ সাম্রাজ্য’ এবং জাহাঙ্গীর আলমের বিপুল সম্পদের বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য নিয়ে আসছে আমাদের পরবর্তী প্রতিবেদন।
সম্পর্কিত সংবাদ
নরসিংদীতে গোসলে দেরি করায় ৭ বছরের মাদ্রাসা ছাত্রকে নির্মম নির্যাতন, অভিযুক্ত শিক্ষক গ্রেফতার
পবিত্র কোরআন শিক্ষার উদ্দেশ্যে মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছিল সাত বছরের শিশু মুজাহিদ। কিন্তু সামান্য গোসল...
নারায়ণগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দুর্নীতির মহোৎসব সাংবাদিকের ওপর ‘টিটু সিন্ডিকেট’-এর হামলা
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ নারায়ণগঞ্জ সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এখন অনিয়ম, ঘুষ লেনদেন আর দালালের আস্তানায়...
মায়ের কবরে শিশুর আর্তনাদ ভাইরাল ভিডিওর পর সৎমাকে তলব, প্রশাসনের হুঁশিয়ারি
নিজস্ব প্রতিবেদক | কুমিল্লা আম্মু, আপনি কেন আমাকে রেখে গেলেন? আমাকেও আপনার কাছে নিয়ে...


Leave a Reply