রাজধানী ঢাকার ডেমরা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মকর্তা, কর্মচারী ও দলিল লেখক ভেন্ডার সমিতির সখ্যতায় একটি অসাধু সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। দলিল নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় প্রতারণা, দায়িত্ব পালনে অবহেলা, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে দুর্নীতির এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে এই চক্র। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সেবাগ্রহীতাদের জিম্মি করে ‘অফিস খরচ’ ও ‘নাস্তা’র নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করাই এই সিন্ডিকেটের মূল লক্ষ্য। প্রতিটি দলিলে পেন্সিলের সাংকেতিক চিহ্নের ইশারায় নির্ধারিত হয় ঘুষের পরিমাণ। টাকা না দিলে আইনি জটিলতার ভয় দেখিয়ে দলিল সম্পাদন বন্ধ রাখা হয়। এমনকি জমির সব কাগজ ঠিক থাকলেও কৌশলে শ্রেণি পরিবর্তন করে মোটা অংকের উৎকোচ দাবি করা হয়।

এই দুর্নীতির মূলে রয়েছেন সাব-রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি শতাংশের হিসাব কষে ঘুষ নেন। শরীয়তপুর সদর উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালেও তার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত টাকা দাবির অভিযোগ উঠেছিল, যা নিয়ে তৎকালীন সময়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডেমরায় যোগদানের পর তিনি তার সাজানো ‘অফিস সিস্টেম’ অনুসারীদের মাধ্যমে ঘুষ বাণিজ্যের নতুন পন্থা অবলম্বন করেছেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, মোটা অঙ্কের টাকা ছাড়া এখানে কোনো জমি রেজিস্ট্রি হয় না। প্রতিদিন আদায়কৃত এই বিপুল অর্থের একটি অংশ স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পেছনে খরচ হলেও সিংহভাগই চলে যায় সাব-রেজিস্ট্রারের পকেটে।

সক্রিয় এই সিন্ডিকেটের সামনের সারিতে রয়েছেন অফিস সহকারী শাহজাহান, উমেদার সাজু, টিপসইয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মচারী ও আউটসোর্সিংয়ে নিযুক্ত নকল নবিশসহ দলিল লেখক সমিতির কতিপয় সদস্য। সরকারি ফি পে-অর্ডারের মাধ্যমে আদায়ের নিয়ম থাকলেও তারা সাব-রেজিস্ট্রারের খরচ ও অফিস খরচের নামে বাড়তি টাকা আদায় করে থাকে। বিশেষ করে হেবা-ঘোষণাপত্র দলিল রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফির বাইরেও সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সামান্য নকল তুলতেও কয়েক গুণ বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে সেবাগ্রহীতাদের।

জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোরও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। ৫ই আগস্টের পূর্বে তৎকালীন আইনমন্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে নিজেকে তার ছোট ভাই পরিচয় দিয়ে চলতেন তিনি। সরকার পরিবর্তনের পর দ্রুত ভোল পাল্টে বর্তমান আইন উপদেষ্টার নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন স্থানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস এসোসিয়েশনের (বি.আর.এস.এ) যুগ্ম মহাসচিব-৩ পদে নির্বাচিত হওয়ার পর তার দাপট আরও বেড়ে গেছে। এমনকি ২০২৪ সালের ১৮ই আগস্ট সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার নির্দেশের প্রতিবাদে সচিবালয় ঘেরাও এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হুমকি প্রদানের ক্ষেত্রেও তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বলে জানা যায়।

বর্তমানে ডেমরা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রতিদিন প্রায় দুই থেকে আড়াইশ দলিল রেজিস্ট্রি হয়। কেরানি, মোহরার থেকে শুরু করে পিওন—সবাই হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকে কথিত ‘ফিস’ আদায়ের জন্য। দিনশেষে সমিতির ফান্ড, কর্মকর্তার ফান্ড ও সেরেস্তা ফান্ডের নামে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ এই অসাধু চক্রের কবলে পড়ে। ক্ষমতার দাপট ও উচ্চমহলে তদবিরের কারণে জাহাঙ্গীর আলম এখনও বহাল তবিয়তে তার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন, যার ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।

এ নিয়ে বিস্তারিত আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য নিয়ে পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *